সম্প্রতি সাভার, আশুলিয়া, উত্তরা ও গাজীপুরের বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানায় একের পর এক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কোথাও শতাধিক শ্রমিক একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, কোথাও আবার চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, শরীর কাঁপা, অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা প্রচণ্ড আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই বিষয়টিকে “জিন-ভূতের আছর” বা অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাব বলে প্রচার করছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কি আমরা সত্যিই এমন ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট থাকতে পারি? নাকি এই ব্যাখ্যার আড়ালে লুকিয়ে যাচ্ছে আরও গভীর, আরও নির্মম একটি বাস্তবতা?
আমার বিশ্বাস, এই ঘটনাগুলো অতিপ্রাকৃত নয়; বরং এটি আমাদের পোশাক শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা শ্রমিক শোষণ, অমানবিক কর্মপরিবেশ, চরম মানসিক চাপ এবং অবহেলার এক নীরব আর্তনাদ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিজ্ঞানীরা এ ধরনের ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে Mass Psychogenic Illness (MPI) বা সমষ্টিগত মানসিক চাপজনিত অসুস্থতা-র কথা বলেন। যখন একটি কর্মস্থলে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত মানুষ একই ধরনের মানসিক চাপ, ভয়, অনিশ্চয়তা ও শারীরিক ক্লান্তির মধ্যে থাকেন, তখন একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে অন্যদের মধ্যেও একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি কোনো অভিনয় নয়, আবার কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনাও নয়। এটি বাস্তব, বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত এবং বিশ্বের বহু দেশে নথিভুক্ত একটি ঘটনা।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে এই ঘটনার পেছনের বাস্তব কারণগুলো খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললেই স্পষ্ট হয় যে, অনেক কারখানায় শ্রমিকদের প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ব্যস্ত রপ্তানি মৌসুমে অনেক সময় কাজ শেষ হতে রাত ২টা কিংবা ৩টাও বেজে যায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও অনেককে কাজে ডাকা হয়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে গভীর রাত, এরপর রান্না, খাওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন শেষে ঘুমাতে যেতে রাত ১টা বা ২টা। আবার ভোর ৫টার মধ্যেই উঠে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হতে হয়।
অর্থাৎ একজন শ্রমিক প্রতিদিন মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা ঘুমিয়ে টানা উৎপাদনের চাকা সচল রাখছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মানুষের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আতঙ্ক এবং আকস্মিক শারীরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি কঠিন বাস্তবতা—অপর্যাপ্ত মজুরি।
আজও অসংখ্য পোশাক শ্রমিক এমন মজুরি পান, যা দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদাই পূরণ করা কঠিন। অনেক শ্রমিক প্রতিদিন ডাল, আলুভর্তা, শাকসবজি কিংবা স্বল্পমূল্যের খাবার খেয়ে দিন পার করেন। পর্যাপ্ত প্রোটিন, দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ফল কিংবা পুষ্টিকর খাদ্য তাদের নাগালের বাইরে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং শারীরিক দুর্বলতা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
এই দুর্বল শরীর নিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত আয়ের জন্য ওভারটাইম যেন তাদের জন্য একটি বাধ্যবাধকতা। কারণ ওভারটাইম না করলে সংসার চলে না, আবার অনেক ক্ষেত্রে ওভারটাইমে অস্বীকৃতি জানালে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও থাকে।
এটি কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়; এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রমবাজারের অনিরাপত্তা থেকে জন্ম নেওয়া এক নীরব বাধ্যবাধকতা।
এমন পরিস্থিতিতে যদি একজন শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে একই মানসিক চাপ ও শারীরিক দুর্বলতায় থাকা অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক। তাই এসব ঘটনাকে “জিন-ভূতের আছর” বলে প্রচার করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানকে ব্যাহত করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে কারখানা কর্তৃপক্ষ ঘটনাকে দ্রুত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। কোথাও ঝাড়ফুঁক, কোথাও ধর্মীয় আচার, কোথাও গুজব—এসবের মাধ্যমে মূল প্রশ্নগুলোকে আড়াল করা হয়। অথচ প্রতিটি ঘটনার পর কারখানার বায়ুমান, রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার, তাপমাত্রা, বায়ুচলাচল, শব্দদূষণ, অগ্নি নিরাপত্তা, কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের সুযোগ এবং শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত।
গাজীপুরের শ্রীপুরে কালার অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডে সুইং অপারেটর লিজা বেগমের মৃত্যুও আমাদের একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—অসুস্থ শ্রমিককে সময়মতো ছুটি, চিকিৎসা এবং মানবিক সহায়তা দেওয়া হলে কি এই মৃত্যু এড়ানো যেত না? প্রতিটি শ্রমিকের জীবন কেবল একটি উৎপাদন সংখ্যা নয়; একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একটি সমাজের মূল্যবান সম্পদ।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আজ বিশ্ববাজারে সাফল্যের প্রতীক। এই শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এবং অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু এই সাফল্যের ভিত্তি গড়ে উঠেছে লাখো শ্রমিকের ঘাম, শ্রম এবং ত্যাগের ওপর। তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না করে টেকসই শিল্পের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
এখন সময় এসেছে সমস্যার মূল কারণের দিকে তাকানোর।
সরকার, কারখানা মালিক, আন্তর্জাতিক ক্রেতা, শ্রমিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, জীবিকা নির্বাহের উপযোগী মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পুষ্টিকর খাদ্যের সুযোগ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমিকবান্ধব ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি কারখানায় নিয়মিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন, মনোসামাজিক সহায়তা এবং স্বাধীন শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শ্রমিক কেবল উৎপাদনের একটি উপাদান নন; তিনি একজন মানুষ। তারও ক্লান্তি আছে, ক্ষুধা আছে, ঘুমের প্রয়োজন আছে, মানসিক চাপ আছে, পরিবার আছে এবং বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
যে কারখানায় বারবার তথাকথিত “জিন-ভূতের আতঙ্ক” দেখা দেয়, সেখানে হয়তো অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির উপস্থিতি নেই। সেখানে রয়েছে অবহেলা, অতিরিক্ত কর্মচাপ, অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সীমাহীন মানসিক চাপের এক নির্মম বাস্তবতা।
সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করাই সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপ। কারণ, অদৃশ্য কোনো জিন নয়—এই শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো দারিদ্র্য, শোষণ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা।
লিখেছেন:
খাইরুল মামুন মিন্টু
শ্রমিক অধিকার কর্মী