1. km.mintu.savar@gmail.com : admin :
  2. editor@biplobiderbarta.com : editor :
শিরোনাম:
দেশে করোনায় মৃত্যু বাড়ল, ৫১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ৯০১ জন। দেশে আগস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের চেয়ে আবার এগিয়ে বাংলাদেশ প্রণোদনা ঋণ ৩৬ কিস্তিতে পরিশোধের সুবিধা চায় বিজিএমইএ পোশাক খাতের ১৬ শতাংশ শ্রমিকের কম মজুরি পাওয়ার শঙ্কায় হাসেম ফুড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মালিকসহ দায়ীদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের দাবি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী ২১ হাজার টাকা নির্ধারণসহ দশ দফা দাবীতে সাংবাদিক সম্মেলন শক্তি ফাউন্ডেশনের উদ্দ্যোগে পাবনা- কাশিনাথপুরে করোনা সচেতনতায়  মাস্ক বিতরণ: হাসেম ফুড কারখানায় আরও একটি খুলিসহ কঙ্কাল ও হাড় উদ্ধার গার্মেন্ট শ্রমিকদের সুরক্ষায় ৫০ ইউনিয়নের যৌথ বিবৃতি

কাশিনাথপুর আব্দুল লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মরহুম মোবারক স্যারের স্মৃতিচারণঃ-

বিশেষ প্রতিনিধিঃ মোঃ রাকিবুল হাসান
  • প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ৩০৩ বার পড়া হয়েছে

কাশিনাথপুর আঃ লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে যে কয়জন পন্ডিত শিক্ষক শিক্ষা দানের জন্য মহান পেশায় ব্রতী হয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেছিলেন তার মধ্যে মরহুম মোবারক স্যার ছিলেন অন্যতম। মোবারক স্যারের জ্ঞানের ভান্ডার ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন কথা ও ছন্দের জাদুকর। ছাত্র ছাত্রীদের তিনি সম্মোহনী শক্তি দ্বারা,ভাষার মাধ্যমে,কথা ও বাচন ভঙ্গী এবং ছন্দের মাধ্যমে জাদুকরের মত বশ করে সবাইকে ক্লাশের প্রতি মনোযোগী তথা মনোনীবেশ করতে পারতেন। এক কথায় তিনি ছিলেন বাক পটু ছন্দের জাদুকর। ক্লাশে অপেক্ষাকৃত দূর্বল অমনোযোগী ছাত্র ছাত্রীদের লেখাপড়ার প্রতি মনোনীবেশ ও মনোযোগী করার ক্ষমতা সব শিক্ষকের থাকেনা। শ্রেণি কক্ষে কোন শিক্ষকের কথা ভালো লাগে আবার কোনো শিক্ষকের কথা ভালো লাগেনা। এক বাক্যে স্যারকে সবাই পছন্দ করতেন এবং সবার প্রিয় স্যার ছিলেন তিনি। স্যারকে বিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষে, আবার শ্রেণি কক্ষের বাহিরে সবাই পছন্দ করতেন । আর তাঁকে পছন্দ করার কারনও ছিল, মোবারক স্যার ছিলেন নদী পারের মানুষ তাই স্যারের মন ছিল নদীর মত উদার। নদী স্যারকে উদার বানিয়েছে, ভালোবাসা শিখিয়েছে ঠিকই কিন্তু নদী স্যারকে, স্যারের পরিবারকে কষ্ঠ ও দিয়েছে অনেক। স্যার এবং স্যারের পরিবার এক সময় নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়েছিল। মোবারক স্যারের পরিবারের সবাই খেলাধুলা, বিনোদন, শিক্ষাদীক্ষার প্রতি ছিল প্রচুর অনুরাগ।
মোবারক স্যারের আদি নিবাস ছিল বসন্তপুর নতুন পাড়া। নলখোলা নামক জায়গার পাশে। তিনি এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল মরহুম ইসমাইল হোসেন। তিনি নলখোলা বাজারে কাসা পিতলের বড় ব্যবসা করতেন। সে আমলে স্যারের বাবাকে কাসা পিতলের বড় মহাজন হিসেবে এক নামে সবাই চিনতেন। তিনি ছিলেন কাসা পিতলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। স্যারেরা ছিলেন ৫ ভাই ২ বোন। স্যার ছিলেন সবার বড়। ছোট বেলা হতেই স্যারের খেলাধুলা, লেখাপড়ার প্রতি প্রবল ঝোক ছিল। তিনি ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ভারেঙ্গা একাডেমী হতে (বিজ্ঞান বিভাগে) কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করেন। ভারেঙ্গা একাডেমী হতে এসএসসি পাশ করার পর রাজবাড়ী কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ২ বছর পড়াশুনা করে বিজ্ঞান বিভাগ হতে এইচএসসি পাশ করেন। এরপর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে বিএস সি পাশ করেন। অতঃপর সমাজ বিজ্ঞানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সৈয়দ আমীর আলী হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। এর মধ্যে পড়া শুনা করার পাশাপাশি ১৯৬৯-১৯৭০ সালে দুলাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোলাম রসুল সাহেবের অবর্তমানে ১ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৭২ সালে সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স সহ স্নাকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে লেখাপড়া শেষ করে প্রথম দিকে তিনি চাকুরীর খোজ না করে ঔষধের ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ঔষধের ব্যবসা করার জন্য লাইসেন্সের প্রয়োজন ছিল বিধায় রাজশাহীতে ৬ মাস ফার্মাসিস্ট কোর্চ করেন। বেশ কিছুদিন তিনি সাফল্যের সাথে ঔষধের ব্যবসা করেন। কিন্তু পরিবার এবং আত্বীয় স্বজন বন্ধু মহল মোবারক স্যার এত বড় উচ্চ শিক্ষিত হয়ে ঔষধের ব্যবসা করুক সেটা সবাই চান নাই।
অবশেষে নাটিয়াবাড়ি ” ধোবাখোলা করনেশন ” উচ্চ বিদ্যালয়ের এর প্রধান শিক্ষক মরহুম আব্দুর রহমানের অনুরোধে তাঁর প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি এক যুগ শিক্ষকতা করেন। নাটিয়াবাড়ি, নলখোলা, নগরবাড়ি এবং আশে পাশের এলাকায় তার প্রচুর ছাত্রছাত্রী আছে। তারা রাষ্ট্রের গুরত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে দেশ বিদেশে মানুষের সেবা করছেন। ১৯৮২ সালে এরশাদের আমলে যমুনা নদী ভাঙ্গন শুরু হলে স্যারের পরিবার কাশিনাথপুরে ( বাবু পাড়া) বাড়ী করে স্হায়ীভাবে পরিবারের সাথে বসবাস শুরু করেন। তখন কাশিনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন মরহুম জয়নাল আবেদীন( সন্তোষ)। সন্তোষ চেয়ারম্যান এবং চেয়াম্যানের ছোট ভাই মরহুম আবু বক্কারের অনুরোধে ১৯৮৪-১৯৮৫ সালের দিকে মোবারক স্যার ধোবাকলা হতে চাকুরী ছেড়ে এসে কাশিনাথপুর বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নতুন চাকুরীতে যোগদান করেন।
মোবারক স্যারকে প্রথম দিকে কেউ চিনতেন না কিন্তু নগর বাড়ী এলাকার সিনিয়র ভাইয়েরা ও ছাত্র ছাত্রীরা ধোবাখোলা স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষককে ( ন্যাকা স্যার) এবং মোবারক স্যারের নাম ঐ এলাকার সবাই কমবেশী জানতেন। আমি মোবারক স্যারের সর্ব প্রথম নাম শুনেছিলাম “বকচরের ” আমার মামা মরহুম দিদার রসুলের কাছে। আমার মামা নতুন ভারেঙ্গা প্রাইমারী স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। আমার মামা দিদার রসুল এবং মোবারক স্যার দুই বন্ধু ছিলেন। মামা মোবারক স্যার সম্বন্ধে বলেছিলেন তিনি খুব ভালো ছাত্র এবং খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন।
কাশিনাথপুর স্কুলে যোগদান করার কিছু দিনের মধ্যেই ছাত্র ছাত্রী এবং অভিবাবক দের নিকট তিনি প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেন। মোবারক স্যার ছিলেন কাশিনথপুর বিদ্যালয়ের চৌকষ (অলরাউন্ডার) শিক্ষক। তিনি ছিলেন মুলতঃ বিজ্ঞানের ছাত্র কিন্তু সব বিষয়ে ছিলেন দক্ষ। তিনি ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ সহকারে পড়াতেন আর ছাত্ররা মনোযোগ সহকারে স্যারের ক্লাশ অনুসরন করতেন। স্যার ক্লাশ আর ক্লাশের বাহিরে সকলের নিকট প্রিয় শিক্ষক এবং অভিবাবক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি খোলামেলা সকলের সাথে ভাব বিনিময় করতেন। তিনি ছিলেন সৎ, তাঁর মনে কোনো প্রকার হিংসা বিদ্বেষ ছিল না। আমি যতদুর জানি স্যার বিজ্ঞান বিষয়ে ভালো পড়াতেন। অংক, জীববিদ্যা, রসায়ন, পদার্থ বিদ্যা ছিল স্যারের প্রিয় বিষয়। তাছাড়া স্যারের সব বিষয়ে কম বেশী সমান দক্ষ ছিলেন। এছাড়া তিনি ভালো বক্তা ছিলেন কোনো বিষয়ে আপোষ করতেন না। সত্য কথা এবং ন্যায়ের কথা বলতে পিছপা হতেন না। ছাত্ররা কোনো বিষয়ে না বুঝলে তিনি বার বার বুঝাতেন, অপরিসীম ধৌর্য ও সাহসী ছিলেন।
ছাত্র ছাত্রীদের সন্তান তুল্য মনে করতেন। ছাত্রছাত্রীরা স্যারকে শ্রদ্ধা ভক্তি সহকারে সম্মান করত। কাশিনাথপুর এবং নাটিয়া বাড়ি, নলখোলা এলাকায় সবাই তাকে এক নামে চিনতেন। তিনি আমাদের প্রিয় শিক্ষক মোবারক স্যার। মোবারক স্যারকে কোনো দিন ভুলবার নয়, যুগ যুগ ধরে স্যার থাকবেন সকলের হৃদয়ের মণি কোঠায়। তাঁর প্রিয় ছাত্র ছাত্রীরা সবাই স্যারের নিকট কমবেশী ঋনী। তিনি সব কিছু উজাড় করে সবাইকে শিক্ষা দান করে গেছেন। তিনি আমাদের নিকট হতে তেমন কিছু পাননি কিন্তু দিয়েছেন অনেক বেশী। তাই মোবারক স্যার বেঁচে থাকবেন চিরোদিন সবার মাঝে। এদের কোনো কোনো মরন নেই। তিনি অবিনশ্বর, চিরঞ্জীব হয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। সর্ব শেষ স্যারকে দেখেছি আমাদের ১৯৮৪ সালের ছাত্র ছাত্রীদের পূর্ণর মিলনী অনুষ্ঠানে। তিনি একে একে সবার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন, প্রিয় বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা সমাজে কে কোথায় অবস্হান করছে তা জানার জন্য। স্যার ছাত্র ছাত্রীদের বলেছিলেন তোমাদের মধ্যে কেউ কি একটি বিশ্ব কোষ এই স্কুলের জন্য কিনে দিতে পারবে। এটা ছিল স্যারের স্কুলের জন্য শেষ ইচ্ছা। আমি মোবারক স্যারের ছাত্র ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলছি যদি কারো সামর্থ থাকে তবে যেন কেউ কাশীনাথপুর বিদ্যালয়ের জন্য একটা বিশ্বকোষ কিনে দেন। তাহলে স্যারের মনের ইচ্ছা পুরন হবে। মোবারক স্যারের ১ছেলে, ১ মেয়ে। বড় ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান( অপু), সে একটি মিডিয়ায় চাকুরী করার সুবাদে ঢাকায় থাকেন। অপু এক সময় ভালো ফুটবল খেলতেন। মোবারক স্যারের আরেক ভাই মাহবুব হোসেন, তাঁকে এক নামে সবাই চেনেন। তিনি ক্রিকেট এবং ফুটবল পাগল মানুষ। সারা জিবন খেলা ধুলার পিছনে সময় ব্যয় করেছেন। কাশিনাথপুরে বড় বড় ফুটবল খেলার প্রধান উদ্যোগতা ছিলেন তিনি। এক নামে সবাই তাকে চেনেন। তিনি নিজে একজন ক্রিকেটার এবং ফুটবলার। তার নেতৃত্বে এক সময় কাশীনাথপুর অনেক জায়গায ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলা আয়োজিত হত। মোবারক স্যারের একমাত্র মেয়ে বিবাহিত সে ঢাকায় আগাঁর গায়ে কোনো এক সরকারী প্রতিষ্ঠানে (প্রজেক্টে) চাকুরী করতেন। বর্তমানে সে রংপুরে তার স্বামীর সহিত পরিবারের সাথে বসবাস করছেন। মোবারক স্যার অকালে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা কেউ ভাবতেই পারেনি। কিন্তু বিধির বিধান কে খন্ডাইতে পারে। সবাই কে তো একদিন নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলেই যেতে হবে। কেউ আগে কেউ পরে। তিনি (স্যার) জিবনে ইচ্ছা করলে সরকারী বড় চাকুরী করতে পারতেন কিন্তু শিক্ষকতা যেহেতু মহান পেশা তাই তিনি এ পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় স্যার অবশেষে ২০১২ সালের ১২ই ফেব্রয়ারী তার প্রিয় স্কুল, পরিবার, প্রিয় ছাত্র ছাত্রীদের মায়া ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে সবাই কে কাঁদিয়ে চির বিদায় নিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। যেখান থেকে কোনো দিন স্যার আর ফিরে আসবেন না। আমরা স্যারকে আর কোনো দিন ফিরে পাব না ঠিকই কিন্তু তাঁর অসমাপ্ত কাজ গুলো আমাদের এগিয়ে নিতে হবে। তাহলে স্যারের আত্বা শান্তি পাবে। স্যারের শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি শান্তি, কল্যাণ, দীর্ঘায়ু কামনা এবং স্যারের আত্বার মাগফেরাত কামনা করে শেষ করছি। খোদা হাফেজ।
লেখক ও স্মৃতিচারণঃ-মোঃ আনিছুর রহমান, এস এস সি ৮৪’ তম ব্যাচ, বিজ্ঞান বিভাগ, কাশিনাথপুর আব্দুল লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়
কাশিনানাথপুর, পাবনা

শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

আমাদের পেজ